ক্যাপসিকাম চাষাবাদ পদ্ধতি - Capsicum Cultivation
ক্যাপসিকাম চাষাবাদ পদ্ধতি - Capsicum Cultivation


ক্যাপসিকাম অর্থ হলো মিষ্টি মরিচ এবং এটি একটি জনপ্রিয় সবজি । ক্যাপসিকাম আমাদের শরীরের ভিটামিনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় । কারণ এতে ভিটামিন এ এবং সি প্রচুর পরিমাণে থাকে । ক্যাপসিকাম খাওয়ায় দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়, কারণ এতে ফাইবার আয়রন এবং অন্যান্য খনিজ পদার্থ যথেষ্ট পরিমাণে থাকে । এর আকার বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে । অনেক সময় ফলগুলো গোলাকার দেখায় আর ত্বক পুরু ধরনের হয়ে থাকে । আমাদের দেশের প্রচলিত সবজি না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাপসিকাম চাষবাদে এবং এর বাণিজ্যিক পরিকল্পনা অনেক বেড়ে চলেছে । ভবিষ্যতে এটি কৃষকদের জন্য অনেক বড় উপকার করবে । বিভিন্ন ধরনের ফাইভ স্টার হোটেল এবং বড় বাজারগুলোতে ক্যাপসিকাম পাওয়া যায় । বাংলাদেশের ক্যাপসিকাম উৎপাদনের সাথে সাথে বিদেশে রপ্তানির সুযোগ অনেক রয়েছে, কারণ বাহিরের দেশ গুলোতে ক্যাপসিকাম এর প্রচলন রয়েছে । আপনি ক্যাপসিকাম চাষের প্রতি বিঘা থেকে প্রায় ৩ হাজার কেজি ক্যাপসিকাম এর ফলন পেতে পারেন । হালকা সবুজ রঙের ক্যাপসিকাম এর দাম সাধারণ বাজারগুলোতে ১৫০ টাকার আশেপাশে । আর হলুদ এবং লাল রঙ্গের ক্যাপসিকাম গুলোর দাম ৩৫০ টাকার উপরে, তাও আবার প্রতি কেজিতে । ক্যাপসিকাম এর বাজার মূল্য এতটা বেশি হওয়ায় আপনি এর থেকে ৩ গুণ লাভ করতে পারেন । কারণ প্রতি বিঘায় ক্যাপসিকাম বীজ উৎপাদনের প্রায় খরচ হয়ে থাকে ৫৫ হাজার টাকার আশেপাশে । আর এই এক বিঘা থেকেই আপনি ১.৫ লক্ষ টাকার বেশি ইনকাম করতে পারেন।

আশা করা যায়, ক্যাপসিকাম এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষকদের অনেক উন্নতি হতে পারে কারণ এর থেকে দ্বিগুন এর চেয়েও বেশি লাভ করা সম্ভব ।

ক্যাপসিকাম চাষ পদ্ধতিঃ

অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে কার সময়টাই ক্যাপসিকাম এর বীজ রোপণের উপযুক্ত সময় । তবে বর্তমানে বাংলাদেশের ঘরোয়া কৃষকরা বারোমাসি এই ফলটি উৎপাদন করতে পারেন । আপনি যদি ক্যাপসিকাম চাষ করতে চান তাহলে বাজার থেকে ক্যাপসিকাম ফল কিনে এর থেকে বীজ সংগ্রহ করেই চাষ করতে পারেন । তাছাড়া ক্যাপসিকাম এর বীজ কিনতে পাওয়া যায় । ওখান থেকে বীজ সংগ্রহ করতে চাইলে পরিপক্ক এবং পূর্ণবয়স্ক ক্যাপসিকাম থেকে বীজ সংগ্রহ করা উচিৎ, কারণ এর থেকে ফলন অনেক ভালো হবে । বিজ সংগ্রহ করার পর একটি পাত্রে মাটি দিয়ে পূর্ণ করে সেখানে 10 থেকে 12 ইঞ্চি গর্ত করে বীজ রাখতে পারেন । যে কোন পাত্রে ক্যাপসিকাম বপন করা যায় । ক্যাপসিকাম এর জন্য উপযুক্ত ঠান্ডা পরিবেশ । এজন্য উদ্ভিদ লাগানোর পরে আদ্রতা বজায় রাখতে নিয়মিত ঝরনা দিয়ে পানি দিতে হবে । কয়েকদিন পরেই ক্যাপসিকাম এর বীজ অঙ্কুরিত হবে । বিজ থেকে ক্যাপসিকাম চাষ করতে চাইলে বিজ থেকে উদ্ভিদগুলো অঙ্কুরিত হওয়ার পরে এগুলো থেকে চারা তৈরি করে নিতে হয় । 

প্রতি শতক জমির জন্য এক গ্রাম ক্যাপসিকাম এর বীজ ই যথেষ্ট বীজ সংগ্রহ করার পর ১২ ঘন্টা পানির মাঝে ভিজিয়ে রাখতে হবে এবং পূর্বে তৈরিকৃত বিজতলায় ১০ সেন্টিমিটার দূরে দূরে, ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটার গভীরে বীজগুলো বোপণ করতে হবে । বীজ বপনের পর নিয়মিত ঝরনা দিয়ে পানি দিতে হবে এক্ষেত্রে বিচ থেকে কুড়ি গজাতে প্রায় ৫ দিন সময় লাগতে পারে আর বীজ বপনের ৭ থেকে ১০ দিন পর, এর কাজটি তিন থেকে চার পাতা বিশিষ্ট হয় । এ অবস্থায় ৯ থেকে ১২ সেন্টিমিটার আকারের পলিব্যাগে ক্যাপসিকাম এর চারাটি সংগ্রহ করে নিতে হবে । ৩ঃ১ঃ১ অনুপাতে মাটি বালি আর কম্পোস্ট মিশ্রিত পলিব্যাগ গুলোতে ক্যাপসিকাম এর চারাগুলো লাগাতে হবে এবং ঠান্ডা জায়গায় বা ছায়াযুক্ত স্থানে রাখতে হবে । 

ক্যাপসিকামের গাছের পরিচর্যাঃ

অঙ্কুরোদগম হওয়ার আগে ক্যাপসিকামের গাছগুলোকে সূর্যালোকে রাখতে হবে । সে ক্ষেত্রে আপনি বাড়ির ভিতর রাখতে পারেন । আবার অঙ্কুরোদগম হওয়ার পর বারান্দায় সূর্যের আলো পৌঁছায় এমন জায়গায় ক্যাপসিকামের টপগুলো রাখতে হবে । তবে খেয়াল রাখবেন গাছগুলোতে যেন অতিরিক্ত সূর্যের আলো না পরে । যে টবে বা পাত্রে চারাগুলো রোপণ করা হয় সেগুলোর আদ্রতার দিকে খেয়াল রাখতে হবে ।

পড়ন্ত বিকেল চারা রোপন করার উত্তম সময় । রোপণের পর চারা গাছ গুলোতে নিয়মিত পানি দিতে হবে ক্যাপসিকামের ছাড়া বৃদ্ধি পেতে ৫০ থেকে ৬০ দিন অর্থাৎ ২ মাস সময় পর্যন্ত লাগতে পারে । আর জমিতে চাষ করতে চাইলে খেয়াল রাখবেন এই ক্যাপসিকাম খরা বা জলাবদ্ধতা কোনটাই সহ্য করতে পারেনা । মাঠে চারা লাগাতে চাইলে প্রথমে ব্যাট তৈরি করে নিতে হবে । বেডের প্রস্থ হতে হবে ৭৫ সেন্টিমিটার এবং লম্বায় ২টি শাড়িতে ২০ টি পর্যন্ত চারা রাখার জন্য ৯ মিটার বেড তৈরি করতে হবে । শাড়ি ২ টির মাঝখানে প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার এর ড্রেন রাখতে হবে । জমি তে নিয়মিত সেচ দিতে হবে আবার খেয়াল রাখতে হবে অতিরিক্ত সেচ যেন না হয় এতে ঢলে পড়া রোগ দেখা দিতে পারে । আর বৃষ্টির ফলে পানি জমে থাকায় যেন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি না হয় । সেজন্য পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো রাখতে হবে । ফল ধরার সময় ক্যাপসিকাম এর কিছু গাছগুলোতে খুটি দিয়ে বাঁধা লাগতে পারে । কারণ ফলের ভরে গাছ গুলো ফেলে যেতে পারে । আগাছা দমনের জন্য আগাছানাশক অথবা হাত দিয়ে নিড়ানি দিয়ে আগাছা দমন করতে হবে ।

গাছে কীটপতঙ্গ এবং পোকামাকড়ের নিয়ন্ত্রণঃ

গাছগুলোকে কোন ধরনের পোকা মাকড়ের আক্রমণের আশঙ্কা হলে টক্সিন মুক্ত দ্রবন ব্যবহার করা উচিত । ঘরোয়া পদ্ধতিতে ১ চামচ সাবানের গুড়ার সাথে ১ চামচ নিমের তেল ১ লিটার পানিতে মিশ্রিত করুন, আর প্রতি সপ্তাহে একবার এই পানি স্প্রে করুন ।

সার ব্যবহারঃ

সারার জন্য জৈব সার হিসেবে শাকসবজি,ফলের খোসার পচা পানি বা পচা পাতা ইত্যাদি মাটিতে মিশ্রিত করে দেওয়া যেতে পারে । উপাদানগুলো মাটির কোন মান বৃদ্ধির সাথে সাথে পৃথিবীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানগুলো প্রদান করে ।

আর জমিতে চাষের ক্ষেত্রে ক্যাপসিকাম এর জন্য প্রতি শতক জমিতে ৪০ কেজি গোবর, ১ কেজি ইউরিয়া, ১.৫ কেজি টিএসপি, ১ কেজি এমপি, ৪৫০ গ্রাম জিপসাম এর সাথে ২০ গ্রাম জিংক অক্সাইড প্রয়োগ করা যেতে পারে । জমি তৈরির সময় জৈব সার হিসেবে অর্ধেক গোবর সার প্রয়োগ করা উচিত । বাকি অর্ধেক গোবর, টিএসপি, জিংক অক্সাইড, জিপসাম ৩ ভাগের ১ ভাগ এমপি এবং ৩ ভাগের ১ ভাগ ইউরিয়া যে স্থানে চারা রোপণ করবেন সেখানে দিতে হবে । চারা লাগানোর ২৫ থেকে ৫০ দিন পর এমপি সারটি তিন ভাগের এক ভাগ এর পরিবর্তে দু ভাগ প্রয়োগ করতে হবে ।

ফল সংগ্রহঃ

মিষ্টি মরিচ নামের এই ফলটি সাধারণ অবস্থায় পরিপূর্ণভাবে পরিপক্ক হওয়ার পূর্বে সবুজ অবস্থাতেই তোলা যায় এবং এর বাজার মূল্য প্রতি কেজিতে দেড়শ টাকা দরে বিক্রি করা সম্ভব । আর পরিপক্ক অবস্থায় লালছে আকার ধারন করলে প্রতি কেজিতে দেড়শ টাকা দরে বিক্রি হয় । সপ্তাহে একবার গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করা উত্তর । অধিকাংশ ক্যাপসিকাম এর গাছ পাঁচটি পর্যন্ত ফল ধরতে পারে । প্রথমবার গাছের ফল আসার পরে সংগ্রহ না করাই উত্তম । কারণ এতে কাজটি শক্তিশালী হবে দ্বিতীয়বার থেকে ফল সংগ্রহ করতে পারেন । তবে খেয়াল রাখবেন যেন ফল সংগ্রহের সময় ফলের সাথে সামান্য বোটা থাকে । এতে করে ফলটি সহজে নষ্ট হবে না। ক্যাপসিকাম এর বাজারমূল্য ভাল পেতে সংগ্রহ করার পর ঠাণ্ডা বা ছায়াযুক্ত স্থানে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে । এতে ফলের চেহারার বিঘ্ন ঘটবে না এবং বাজারমূল্য ভালো পাওয়া যাবে ।


এটাই ছিল ক্যাপসিকাম চাষের পূর্ব থেকে ফল সংগ্রহ অব্দি প্রক্রিয়া । সবাইকে ক্যাপসিকাম চাষের প্রতি অনুপ্রেরণা দিতে হবে । কারণ ক্যাপসিকাম এর মাধ্যমেই কৃষকদের আর্থিক অবস্থা উন্নতির কথা চিন্তা করা যায় বর্তমান পরিস্থিতিতে ।